মেনু পরিকল্পনা

মেনু পরিকল্পনা বলতে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী বয়স, আয়, পরিশ্রম, শারীরিক অবস্থা, উপলক্ষ্য ইত্যাদি বিবেচনা করে পরিবার, প্রতিষ্ঠান অথবা কোনো অনুষ্ঠানে যে তালিকা তৈরি করা হয় তাকে মেনু পরিকল্পনা বলে। মেনু পরিকল্পনায় প্রত্যেক সদস্যের পছন্দ-অপছন্দের খাদ্য, প্রস্তুত পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মেনু পরিকল্পনার মাধ্যমে সুষম, আকর্ষণীয় ও পুষ্টি গুণাগুণসমৃদ্ধ খাদ্য পরিবেশন করা যায়। তাই খাদ্য পরিবেশনের আগে মেনু পরিকল্পনা করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

মেনু পরিকল্পনার নীতি

মেনু পরিকল্পনা খাদ্যের একটি তালিকা বিশেষ। মেনু পরিকল্পনা করার সময় কতগুলো নীতি অনুসরণ করতে হয়। নিচে মেনু পরিকল্পনার নীতিসমূহ বর্ণনা করা হলো:
১। আয়: খাদ্য পরিকল্পনা করার পূর্বে জিনিসপত্রের বাজার দর সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। আয় বেশি হলে মেনু বৈচিত্র্যময় ও দামি খাবার সংযোজন করা যায়। পরিবারের আয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্য পরিকল্পনা করতে হবে। খাদ্যের গুণগতমান বিচার করে পরিবারের আয় অনুযায়ী খাদ্য নির্বাচন করে মেনু পরিকল্পনা করতে হবে।
২। বয়স: বয়স অনুযায়ী ব্যক্তি বিশেষে খাদ্যের চাহিদা ভিন্ন হয়। যে কারণে একটি শিশু ও কিশোর-কিশোরীর খাদ্য চাহিদাও ভিন্ন হয়। একটি শিশু ও কিশোর কিশোরীর যে পরিমাণ খাদ্যের প্রয়োজন তা একজন প্রাপ্তবয়স্ক বা বৃদ্ধের জন্য প্রযোজ্য নয়। কাজেই বয়স অনুযায়ী প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন খাদ্য প্রয়োজন। সুতরাং, মেনু পরিকল্পনার সময় শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ ইত্যাদি বয়সসীমা মাথায় রেখে খাদ্য পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
৩। সদস্যসংখ্যা: কম সদস্যবিশিষ্ট পরিবার মাছ, মাংস, ডিম, দুধ যেভাবে খেতে পারে, একই আয়ে বেশি সদস্যবিশিষ্ট পরিবার সেভাবে খেতে পারে না। তবে আয় যাই হোক না কেন, খাবারের পুষ্টিমূল্য ঠিক রেখে খাদ্য পরিকল্পনা করা উচিত।
৪। শ্রম: মেনু পরিকল্পনার সময় শারীরিক পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে মেনু পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। কঠোর পরিশ্রমী ব্যক্তির স্নেহ ও কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্যের পরিমাণ বেশি হওয়া উচিত। অপরদিকে, হালকা শ্রমে লিপ্ত ব্যক্তিদের খাদ্যে কার্বোহাইড্রেট, তেল ও চর্বি জাতীয় খাদ্য কম থাকা দরকার।
৫। লিঙ্গ: লিঙ্গভেদে ক্যালরি ও প্রোটিনের চাহিদা ভিন্ন হয়। ছেলের চেয়ে মেয়েদের দেহের আয়তন ও পেশির পরিমাণ কম থাকায় মেয়েদের ক্যালরি, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের চাহিদা অপেক্ষাকৃত কম। তবে মেয়েদের লৌহ জাতীয় খাদ্য বেশি করে খাওয়া উচিত।
৬। স্বাস্থ্য: পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনা করে মেনু পরিকল্পনা করতে হবে। হঠাৎ কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়লে তার জন্য পথ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। খাদ্য পরিকল্পনা করার সময় ব্যক্তির স্বাস্থ্য যে যে সমস্যায় আক্রান্ত, তা বিবেচনা করে মেনু পরিকল্পনা করা উচিত। বিভিন্ন রোগে বিশেষ খাদ্য উপাদান নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। যেমন- ডায়াবেটিস রোগে কার্বোহাইড্রেট, কিডনী রোগে প্রোটিন নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
৭। রুচি: প্রত্যেক ব্যক্তির খাদ্যের রুচি ভিন্ন হয়। কেউ মিষ্টি, কেউ মসলাদার বা কেউ ঝাল খাবার পছন্দ করে। যেমন-কেউ দুধ খেতে না চাইলে দুধের পরিবর্তে ফিরনি, পায়েস, পুডিং ইত্যাদি রাখা যেতে পারে। আবার, এমন খাবার তৈরি করার কথা বিবেচনা করতে হবে যেন সবার পছন্দনীয় ও রুচিসম্মত হয়। মেনু পরিকল্পনার সময় রুচির বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, খাদ্য রুচিসম্মত না হলে তৃপ্তিদায়ক হয় না।
৮। আবহাওয়া ও ঋতুভেদে: আবহাওয়া বা ঋতুভেদে খাদ্য পরিকল্পনা আলাদা হতে দেখা যায়। প্রত্যেক মৌসুমে কোনো না কোনো খাদ্য ও সবজির প্রাধান্য দেখা যায়। যেমন- শীতকালে বিভিন্ন সবজি, মাছ, মাংস, ডিমের সাথে চা, কফি, স্যুপ ইত্যাদি প্রাধান্য দেয়া উচিত। গ্রীষ্মকালে কম পরিমাণে মাছ, মাংসের সাথে নানা ধরনের ফল, জুস, শরবত ইত্যাদি খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। ভাজা ও মচমচে খাদ্য বর্ষাকালে রাখা উচিত।
৯। খাদ্য সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা: গর্ভবতী, প্রসূতি মা ও শিশুরা ভ্রান্ত ধারণার ফলে অপুষ্টির শিকার হয়। কাজেই খাদ্য সম্পর্কিত ভ্রান্ত ধারণা বাদ দিয়ে প্রত্যেকের দৈহিক চাহিদামতো খাদ্য মেনুতে রাখা উচিত।
১০। রান্না পদ্ধতি: সঠিক রান্না পদ্ধতির অভাবে অনেক দামি খাবারও গ্রহণযোগ্যতা হারায়। সাধারণত ঝলসানো, ভাপে রান্না, ভাজা, বেকড্ ইত্যাদি বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে রান্না করা হলে অনেক খাদ্য উপাদান নষ্ট হয়। তাই মেনু পরিকল্পনার সময় খাবার রান্নায় সঠিক পদ্ধতি যাতে অবলম্বন করা হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
১১। বৈচিত্র্য ও স্বাদ: খাবারে বৈচিত্র্য আনতে ও একঘেয়েমি দূর করতে মেনুতে বিভিন্ন রং, স্বাদ, বিভিন্ন ধরন, ঘনত্ব ও ঘ্রাণের খাবার অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
১২। উৎসব ও অনুষ্ঠান: আমাদের দেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন- ঈদ, পূজা, পহেলা বৈশাখ, জন্মদিন, গায়ে হলুদ, বিয়ে ইত্যাদি অনুষ্ঠান পালন করা হয়। উৎসব ও অনুষ্ঠানভেদে মেনু পরিকল্পনার তারতম্য হয়। মেনু পরিকল্পনার সময় সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত।

মেনু পরিকল্পনার গুরুত্ব

জাতীয় স্বাস্থ্য রক্ষায় এবং নিরাপত্তার জন্য উন্নত বিশ্বে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে খাদ্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকে। প্রদত্ত আয় ও সঞ্চয়সীমার মধ্যে খাদ্য উপাদানের চাহিদা ভিত্তিক খাদ্য তালিকা বা মেনু তৈরি করা হয়। এই মেনু তৈরি করতে গিয়ে কিছু বিষয় মনে রাখতে হয়।
১। মেনু পরিকল্পনা করে খাদ্য প্রস্তুত করলে অপচয় কম হয় এবং সীমাবদ্ধ আয়ের উৎস দিয়ে উপযুক্ত মেনু করা যায়।
২। যেহেতু পরিবারের সদস্যদের বয়স, লিঙ্গ, শরীরিক অবস্থা ইত্যাদি বিবেচনা করে মেনু প্রস্তুত করা হয়, তাই পরিবারের সদস্যদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয়।
৩। ঋতু ও আবহাওয়া অনুযায়ী খাদ্য মেনুতে রাখার কারণে মৌসুমি সবজি ও ফল সম্পর্কে পরিবারের শিশুদের ধারণা হয়।
৪। দেশ, জাতি, ধর্ম ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে খাদ্য পরিকল্পনা করা হয় বলে উক্ত মেনু পরিকল্পনা সম্পর্কে কারও কোনো আপত্তি থাকে না।
৫। মেনু পরিকল্পনা করে খাদ্য প্রস্তুত করলে খাদ্যের পর্যাপ্ততা থাকে যা পরিবারের সকল সদস্যের প্রয়োজন মেটায়।
৬। মেনু পরিকল্পনার সময় পরিবারের সদস্যদের পছন্দ, অপছন্দ, বিশেষ কোনো খাদ্যের প্রতি আগ্রহ বা উদাসীনতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কারণে মেনু পরিকল্পনা সবার পছন্দের হয়।
৭। মেনু পরিকল্পনার মাধ্যমে খাদ্য গ্রহণকারীর চাহিদা ও ব্যবস্থাপনার সুবিধার দিকে লক্ষ্য রাখা হয় বলে খাদ্য ক্রয়, খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশনের কাজ সুষ্ঠু ও সংক্ষিপ্ত হয়।
৮। সুপরিকল্পিত মেনু পরিকল্পনা সুষম খাদ্যের এবং পুষ্টির চাহিদা যেমন পূরণ করে তেমনি খাদ্য ক্রয়, খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশনের কাজ সুষ্ঠু ও সংক্ষিপ্ত করে।
৯। সুপরিকল্পিত মেনু আকর্ষণীয় হয় এবং বিজ্ঞান ও শিল্পের বৈশিষ্ট্য থাকে। খাদ্যদ্রব্য রন্ধন পদ্ধতিও সঠিকভাবে হয়।
উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, মেনু পরিকল্পনার গুরুত্ব অপরিসীম।

error: Content is protected !!