যোগ মুখ্যত সাধনশাস্ত্র ও প্রয়োগবিদ্যা। পতঞ্জলি যোগসূত্রের সাধনপাদে ও বিভূতিপাদে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বিবেকখ্যাতি অর্থাৎ প্রকৃতি-পুরুষের-ভেদজ্ঞান যাকে পতঞ্জলি কৈবল্যলাভের উপায় বলে উল্লেখ করেছেন তার জন্য যোগাঙ্গের অনুষ্ঠান করতে হবে। যোগানুষ্ঠান মোক্ষের কারণ।
সাংখ্য-যোগ দার্শনিকদের মতে, দেহ, মন, ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি থেকে ভিন্ন চৈতন্যস্বভাব আত্মার সম্যকজ্ঞান পরমপুরুষার্থ কৈবল্যলাভের উপায়। যোগদার্শনিকদের মতে চিত্তশুদ্ধি না হলে কৈবল্য বা সমাধিযোগের অবস্থা লাভ করা যায় না। যোগের অবস্থায় উপনীত হতে চিত্তের মলিনতা দূর হওয়া প্রয়োজন। চিত্ত সম্পূর্ণরূপে নির্মল ও বিষয়-বীজ মুক্ত হলেই আত্মার চৈতন্যস্বরূপতা প্রকট হয় ও সমাধিযোগ লাভ হয়। অভ্যাস ও বৈরাগ্য চিত্তবৃত্তিনিরোধের উপায় (‘অভ্যাস বৈরাগ্যাভ্যাং তৎ নিরোধঃ’- যোগসূত্র, সমাধিপাদ-১২)। যোগশাস্ত্রে বলা হয়েছে, “যাঁরা ধারণা, ধ্যান, সমাধি প্রভৃতির অভ্যাস করবার মতো চিত্তের শুদ্ধি ও একাগ্রতা লাভ করেননি, তাঁরা প্রথমে ক্রিয়াযোগ অর্থাৎ তপস্যা (সংযম ও কৃষ্ণ) স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর প্রণিধানের দ্বারা, এবং মৈত্রী, মুদিতা ও উপেক্ষার অভ্যাসরূপ চিত্তপরিকর্মের (চিত্তশুদ্ধির সাধন) দ্বারা যোগানুষ্ঠানের যোগ্যতা লাভ করে যমনিয়মাদি অষ্টাঙ্গ যোগ অবলম্বন করবেন।” চিত্তবৃত্তিনিরোধরূপ যোগ লাভের জন্য যোগদর্শন অষ্টবিধ সাধন বা উপায় অনুশীলনের উপদেশ দিয়েছে। এদেরই যোগাঙ্গ বলে। যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি-এই আটটি যোগ সাধনার অঙ্গস্বরূপ (‘যমনিয়মাসন-প্রাণায়াম প্রত্যাহারধারণাধ্যানসমাধয়োহষ্টাঙ্গানি’)। যোগরূপ অঙ্গীর অঙ্গ বলে যম নিয়মাদিকে যোগাঙ্গ বলে। শ্রদ্ধা, নিষ্ঠা এবং একাগ্রতা নিয়ে এদের অনুশীলন করলে সম্প্রজ্ঞাত ও অসম্প্রজ্ঞাত উভয়বিধ সমাধি লাভ করা যায়। নীচে অষ্টযোগাঙ্গ ব্যাখ্যা করা হল:
১. যম: অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ এগুলিকে যম বলে (‘অহিংসাসত্যাস্তেয় ব্রহ্মচর্যাপরিগ্রহা যমাঃ’)। যম নিষেধাত্মক বিধিকে বোঝায়। অহিংসা হল সর্বপ্রকার হিংসা থেকে বিরতি। সত্য হল বাক্য বা কাজে মিথ্যাচরণ না করা। অস্তেয় হল চৌর্য বা বলপূর্বক অপরের বস্তু গ্রহণ না করা। কোনভাবে পরের দ্রব্যে স্পৃহা না করা বা অস্পৃহাই অস্তেয়। সর্বপ্রকার কামভোগাদিতে সংযমই ব্রহ্মচর্য। ব্রহ্মচর্যের সরলার্থ হল শরীর ও মনের পবিত্রতা। যোগ লাভেচ্ছু ব্যক্তির সর্বদা ব্রহ্মচর্য পালন কর্তব্য। অপরিগ্রহ হল অপরের কাছে কোন কিছু গ্রহণ না করা। অপরিগ্রহ সাধন না করে ভোগের বিষয়ের চিন্তায় সর্বদা ব্যাপৃত থাকলে চিত্তে নানা বিক্ষেপ উপস্থিত হয় এবং যোগসাধনা সম্ভব হয় না।
২. নিয়ম: নিয়ম হল নিয়মিত অভ্যাস ও ব্রতপালন। নিয়ম পাঁচপ্রকার: শৌচ, সন্তোষ, তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর প্রণিধান (‘শৌচসন্তোষতপঃ স্বাধ্যায়েশ্বর প্রণিধানি নিয়মাঃ’)। শৌচ দুপ্রকার: বাহ্য শৌচ, যেমন, প্রাত্যহিক স্নান, সাত্ত্বিক আহার ইত্যাদি এবং আন্তর শৌচ হল কাম, ক্রোধ, লোভ প্রভৃতি থেকে মুক্ত হয়ে চিত্তের শুদ্ধি। সন্তোষ হল প্রাপ্ত বিষয়ে সন্তুষ্ট থাকা। তপস্যা হল ক্ষুধাতৃষ্ণা, শীতোষ্ণাদি প্রভৃতি সহ্য করা, অথবা ইন্দ্রিয়কে সংযত করা। স্বাধ্যায় বলতে প্রণব বা ওঁকারের জপ অথবা অধ্যাত্ম শাস্ত্র অধ্যয়নকে বোঝায়। ঈশ্বর প্রণিধান বলতে ঈশ্বরের চিন্তা এবং সকল কর্ম ও কর্মফল ঈশ্বরে সমর্পণ করাকে বোঝায়। ঈশ্বর প্রণিধান বলতে ঈশ্বরে ভক্তিবিশেষকেও বোঝান হয়ে থাকে।
যোগসাধনার জন্য যম ও নিয়ম পালন অপরিহার্য। কিন্তু কোন একটি নিয়ম কিছুকাল পালন করলে চলে। কিন্তু অহিংসা প্রভৃতি সর্বদা পালনীয়। নতুবা অধঃপতন অনিবার্য।
৩. আসন: দেহকে স্থির (নিশ্চল) ভাবে সুখজনক অবস্থায় স্থাপন করাই হল আসন (‘স্থিরসুখমাসনম্’)। যোগাভ্যাসের জন্য শারীরিক নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক নিয়ন্ত্রণ উভয়ই প্রয়োজন। দেহ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন আসনের উল্লেখ যোগশাস্ত্রে আছে। এসব আসনের মধ্যে পদ্মাসন, ভদ্রাসন, বীরাসন, স্বস্তিকাসন, দণ্ডাসন প্রভৃতি প্রধান। আসন অভ্যাসের উদ্দেশ্য শরীরকে নিজ অধীনে আনা। মনকে একাগ্র করার জন্য আসন অভ্যাস করা প্রয়োজন।
৪. প্রাণায়াম: প্রাণ বা শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি সংযত করাকে প্রাণায়াম বলে (‘শ্বাসপ্রশ্বাসয়োঃ গতি বিচ্ছেদঃ প্রাণায়ামঃ’।) প্রাণায়াম হল শরীরস্থিত জীবনীশক্তিকে বশে আনা। প্রাণায়াম ত্রিবিধ। শ্বাস ত্যাগ করে ভিতরের বায়ুকে বাইরে স্থাপন করার পদ্ধতিকে বাহাবৃত্তি বা রেচক বলে। বাইরের বাতাস শ্বাসের দ্বারা গ্রহণ করে ভিতরে রাখাকে আভ্যন্তরবৃত্তি বা পূরক বলে। গৃহীত বায়ু দেহের মধ্যে ধরে রেখে সমগ্র শরীরকে বায়ুপূর্ণ করাকে বলে স্তম্ভবৃত্তি বা কুম্ভক। রেচক, পূরক ও কুম্ভক দ্বারা শ্বাসপ্রশ্বাসের স্বাভাবিক গতির নিয়মন হয় বলে এই তিনটি মিলিত হয়ে একটি প্রাণায়াম হয়। প্রাণায়াম সফল হলে চিত্ত স্থির হয় ও যোগের পথ সুগম হয়।
৫. প্রত্যাহার: ইন্দ্রিয়গুলিকে তাদের নিজ নিজ বিষয় থেকে সরিয়ে এনে চিত্তের অনুগত করাই প্রত্যাহার (‘স্ববিষয়াসম্প্রয়োগে চিত্তস্বরূপানুকার ইবেন্দ্রিয়াণাং প্রত্যাহারঃ’)। ইন্দ্রিয়গুলি বহির্মুখী হলে চিত্তের চাঞ্চল্য দেখা দেয় ও যোগের বিঘ্ন হয়। ইন্দ্রিয়গুলি চিত্তের দ্বারা চালিত হলে বিষয়াসক্তি দূর হয় ও যোগসাধনা সম্ভব হয়। পতঞ্জলি যোগসূত্রের বিভূতিপাদে ধারণা, ধ্যান ও সমাধি-এই তিনটি যোগাঙ্গের নিরূপণ করেছেন।
৬. ধারণা: চিত্তকে কোন বস্তুতে ধরে রাখাকে ধারণা বলে (‘দেশবন্ধশ্চিতস্য ধারণা’)। শরীরের ভিতরের বা বাইরের কোন বস্তুতে চিত্তকে সংলগ্ন করে কিছুক্ষণ ঐভাবে থাকাকে বলে ধারণা। অন্য বিষয় থেকে সরিয়ে এনে চিত্তকে শরীরের মধ্যে নাভিচক্র, নাসিকার অগ্রভাগ প্রভৃতি স্থানে অথবা বিষ্ণু, ইন্দ্র প্রভৃতির মূর্তিতে চিত্তকে স্থির রাখাই ধারণা।
৭. ধ্যান: সেই বস্তুবিষয়ক প্রত্যয় বা বৃত্তি নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হলে তাকে ধ্যান বলে (‘তত্র প্রত্যয়ৈকতানতা ধ্যানম্’)। ধারণার গভীরতর ও দীর্ঘস্থায়ীরূপ হল ধ্যান। ধারণার ক্ষেত্রে চিন্তার বিচ্ছেদ ঘটে, কিন্তু ধ্যান হল অবিচ্ছিন্ন চিন্তাপ্রবাহ। ধ্যানের ক্ষেত্রে প্রত্যয়ের কোন বিরতি বা বিচ্ছেদ হয় না।
৮. সমাধিঃ ধারণা অবিচ্ছিন্ন হলে ধ্যান হয় এবং ধ্যান গভীর হলে সমাধি হয়। সমাধির অবস্থায় ধ্যেয় বস্তুমাত্রই প্রকাশিত হয়। ধ্যাতা, ধ্যান ও ধ্যেয়ের ভেদ লুপ্ত হয়ে যায়। যখন ধ্যানের বস্তুর আকৃতি ও বাহ্যরূপ পরিত্যক্ত হয় এবং কেবল অর্থমাত্র প্রকাশিত হয় তখন তাকে সমাধি বলে। চিত্ত তখন ধোয় বস্তুতে লীন হয়, ধ্যেয় স্বরূপই প্রাপ্ত হয়। চিত্তের তখন স্বরূপশূন্য অবস্থা, অর্থাৎ ঐ অবস্থায় চিত্তের পৃথক সত্তাই অনুভূত হয় না। (‘তদেবার্থমাত্রানির্ভাসং স্বরূপশূন্যমিব সমাধিঃ’)। ধারণা, ধ্যান ও সমাধি-এই তিনটি এক বস্তু সম্বন্ধেই অভ্যস্ত হলে তাকে সংযম বলে (‘এয়মেকত্র সংযমঃ’)। চিত্ত বা মনকে শূন্য করতে সমর্থ হলেই সংযম চূড়ান্ত হয়।
ধারণা, ধ্যান ও সমাধিকে সম্প্রজ্ঞাত সমাধির অন্তরঙ্গ সাধন বলা হয়েছে। যমনিয়মাদি পাঁচটি বহিরঙ্গ সাধন। সম্প্রজ্ঞাত সমাধির বিষয় এবং ধারণা, ধ্যান ও সমাধির বিষয় সমান বলে ধারণা, ধ্যান, সমাধিকে সম্প্রজ্ঞাত সমাধির অন্তরঙ্গ সাধন বলা হয়েছে। যমনিয়মাদির সেরূপ কোন বিষয় নাই। তাই সেগুলিকে সম্প্রজ্ঞাত সমাধির বহিরঙ্গ সাধন বলা হয়েছে। যমনিয়মাদি পালনের দ্বারা চিত্ত সমাধির জন্য প্রস্তুত হয়, কিন্তু এগুলি সমাধির সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে সম্পর্কিত নয়। ধারণা, ধ্যান, সমাধি চিত্তবৃত্তিনিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই যমনিয়মাদি পাঁচটি যোগের বহিরঙ্গসাধন, শেষের তিনটি যোগের অন্তরঙ্গ সাধন। অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি নির্বীজ বা নিরালম্ব বলে ধারণা, ধ্যান, সমাধি নির্বীজ সমাধির পক্ষে বহিরঙ্গস্বরূপ (‘তদপি বহিরঙ্গং নির্বীজস্য’)।