আইসোবার কাকে বলে? আইসোবারের বৈশিষ্ট্যসমূহ

আইসোবার কাকে বলে? 

যে সকল পরমানুর ভর সংখ্যা বা নিউক্লিয়ন সংখ্যা অর্থাৎ প্রোটন ও নিউট্রনের মিলিত সংখ্যা একই কিন্তু পারমানবিক সংখ্যা ভিন্ন তাদেরকে পরস্পরের আইসোবার বলে। অর্থাৎ আইসোবার সমূহ ভিন্ন ভিন্ন মৌলের পরমাণু। যেমন – টেলুরিয়াম (Te) ও আয়োডিন (I) পরস্পরের আইসোবার।

যেসব পরমাণুর ভর সংখ্যা (Mass Number) সমান কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা (Atomic Number) ভিন্ন, তাদের একে অপরের আইসোবার বলা হয়। সহজ কথায়, এদের নিউক্লিয়াসে প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সমষ্টি একই থাকে, কিন্তু প্রোটনের সংখ্যা আলাদা হয়। যেহেতু পারমাণবিক সংখ্যা ভিন্ন, তাই আইসোবারগুলো ভিন্ন ভিন্ন মৌলিক পদার্থের পরমাণু হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, আর্গন-40 এবং ক্যালসিয়াম-40 একে অপরের আইসোবার, কারণ উভয়েরই ভর সংখ্যা 40।

আইসোবারের বৈশিষ্ট্যসমূহ

  • আইসোবারসমূহ ভিন্ন মৌলের পরমাণু।
  • তাদের পারমাণবিক সংখ্যা তথা প্রোটন সংখ্যা ও নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন কিন্তু ভর সংখ্যা একই।
  • পারমানবিক সংখ্যা ভিন্ন হওয়ায় পরস্পরের আইসোবারসমূহ পর্যায় সারণিতে ভিন্ন অবস্থানে থাকে।

Frequently Asked Questions

আইসোবারের ভৌত বৈশিষ্ট্য কেমন হয়?

আইসোবারগুলোর ভৌত বৈশিষ্ট্য সাধারণত ভিন্ন হয়ে থাকে। কারণ আইসোবারগুলো ভিন্ন ভিন্ন মৌলের পরমাণু। এদের পারমাণবিক ভর প্রায় সমান হলেও এদের ঘনত্ব, গলনাঙ্ক, স্ফুটনাঙ্ক এবং অন্যান্য ভৌত ধর্ম আলাদা হয়। যেহেতু এদের ইলেকট্রন বিন্যাস এবং প্রোটন সংখ্যা আলাদা, তাই এদের ভৌত গঠনে কোনো মিল থাকে না। কেবল ভরের দিক থেকে মিল থাকায় এদেরকে একই শ্রেণিতে ফেলা হয়, কিন্তু ভৌতভাবে এরা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।

আইসোবারগুলোর রাসায়নিক ধর্ম কি একই রকম?

না, আইসোবারগুলোর রাসায়নিক ধর্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। কোনো মৌলের রাসায়নিক ধর্ম নির্ভর করে তার পারমাণবিক সংখ্যা বা প্রোটন সংখ্যার ওপর, যা তার ইলেকট্রন বিন্যাস নির্ধারণ করে। যেহেতু আইসোবারগুলোর পারমাণবিক সংখ্যা ভিন্ন, তাই এদের ইলেকট্রন বিন্যাসও ভিন্ন হয়। ফলে এরা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ভিন্ন ভিন্ন আচরণ প্রদর্শন করে। যেমন— পটাশিয়াম একটি তীব্র সক্রিয় ধাতু হলেও তার আইসোবার আর্গন একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস।

আইসোবার ও আইসোটোপের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

আইসোটোপ হলো একই মৌলের পরমাণু যাদের পারমাণবিক সংখ্যা সমান কিন্তু ভর সংখ্যা ভিন্ন। অন্যদিকে, আইসোবার হলো ভিন্ন ভিন্ন মৌলের পরমাণু যাদের ভর সংখ্যা সমান কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা ভিন্ন। আইসোটোপের রাসায়নিক ধর্ম একই থাকে কারণ তাদের প্রোটন সংখ্যা সমান। কিন্তু আইসোবারের রাসায়নিক ধর্ম সম্পূর্ণ আলাদা হয়। আইসোটোপ পর্যায় সারণিতে একই স্থানে থাকে, কিন্তু আইসোবারগুলো পর্যায় সারণির ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে অবস্থান করে।

আইসোবার কেন তৈরি হয়?

আইসোবার সাধারণত তেজস্ক্রিয় ক্ষয় বা নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয়। বিশেষ করে বিটা ক্ষয় (β-decay) প্রক্রিয়ায় একটি নিউট্রন প্রোটনে রূপান্তরিত হয় অথবা একটি প্রোটন নিউট্রনে রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় পরমাণুর মোট ভর সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা এক একক বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়। ফলে একটি নতুন মৌল সৃষ্টি হয় যা আদি মৌলের আইসোবার হিসেবে পরিচিত হয়। প্রকৃতির স্থিতিশীলতা অর্জনের প্রক্রিয়ায় আইসোবার সৃষ্টি একটি সাধারণ ঘটনা।

পর্যায় সারণিতে আইসোবারের অবস্থান কোথায়?

পর্যায় সারণিতে আইসোবারগুলোর অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। পর্যায় সারণি সাজানো হয়েছে পারমাণবিক সংখ্যার ক্রমানুসারে। যেহেতু আইসোবারগুলোর পারমাণবিক সংখ্যা ভিন্ন, তাই তারা পর্যায় সারণির ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ এবং পর্যায়ে অবস্থান করে। উদাহরণস্বরূপ, আয়রন (Fe) এবং নিকেলের (Ni) কিছু আইসোবার থাকতে পারে, কিন্তু তাদের পারমাণবিক সংখ্যা যথাক্রমে ২৬ এবং ২৮ হওয়ায় তারা পর্যায় সারণিতে ভিন্ন ভিন্ন ঘরে অবস্থান করে এবং তাদের বৈশিষ্ট্যও আলাদা হয়।

তেজস্ক্রিয়তায় আইসোবারের গুরুত্ব কী?

তেজস্ক্রিয়তার গবেষণায় আইসোবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিটা (β) রশ্মি বিকিরণের সময় আইসোবার সৃষ্টি হয়। যখন কোনো নিউক্লিয়াস থেকে একটি ইলেকট্রন (বিটা কণা) নির্গত হয়, তখন তার পারমাণবিক সংখ্যা ১ বেড়ে যায় কিন্তু ভর সংখ্যা একই থাকে। এটি বিজ্ঞানীদের তেজস্ক্রিয় রূপান্তর এবং নিউক্লীয় স্থিতিশীলতা বুঝতে সাহায্য করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং ভূতত্ত্ববিদ্যায় বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় আইসোবার ব্যবহার করে পদার্থের বয়স নির্ধারণ বা রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হয়।

পারমাণবিক ভরের ক্ষেত্রে আইসোবার কী ভূমিকা রাখে?

আইসোবারগুলো প্রমাণ করে যে পারমাণবিক ভর কোনো মৌলের একক বৈশিষ্ট্য নয়। অর্থাৎ, একই পারমাণবিক ভর একাধিক মৌলের থাকতে পারে। এটি ডাল্টনের পরমাণুবাদের সেই সীমাবদ্ধতা ধরিয়ে দেয় যেখানে বলা হয়েছিল একই মৌলের সব পরমাণু সমান এবং ভিন্ন মৌলের পরমাণু ভিন্ন। আইসোবার দেখায় যে ভিন্ন মৌল হওয়া সত্ত্বেও তাদের ভর সমান হতে পারে। এটি রসায়নের আধুনিক গবেষণায় এবং নিউক্লিয়ার মডেল তৈরিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

error: Content is protected !!