সাম্যের প্রকারভেদ : সাম্যের বিভিন্ন রূপ রয়েছে। আর এ বিভিন্ন রূপের ধারণা ও প্রকৃতি থেকে সাম্যের যথাযথ স্বরূপ ও প্রকৃতি উপলব্ধি করা যায়। নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হলোঃ
প্রাকৃতিক সাম্যঃ প্রকৃতি সকল মানুষকে সমানভাবে সৃষ্টি করে নি। বিভিন্ন দিক থেকে মানুষে মানুষে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তা সত্বেও লক্ষ্য রাখা উচিত যাতে করে সমাজে বসবাসকারী মানুষ কোনরূপ কৃত্রিম বৈষম্য সৃষ্টি না করে। কোন প্রকার কৃত্রিম বৈষম্য থাকলে সমাজে সাম্যের উপলব্ধি ব্যাহত হতে বাধ্য।
আইনগত সাম্যঃ রাষ্ট্রীয় আইনের অধীনে মানুষ যে সমান অধিকার ভোগ করে সেটিই আইনগত সাম্য নামে অভিহিত। আইনের দৃষ্টিতে সকলে সমান এটিই হলো আইনগত সাম্যের প্রকৃত অর্থ। রাষ্ট্রের আইন যদি সকলকে সমান দৃষ্টিতে দেখে তাহলেই আইনগত সাম্য বিদ্যমান আছে বলে মনে করা যায়। অবশ্য আইনগত সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক বৈষম্যের অপসারণ করাও একান্তপ্রয়োজন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে আইন সকলের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য।
নাগরিক সাম্যঃ রাষ্ট্রের সকল নাগরিক যখন সমানভাবে নাগরিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার ভোগ করার সুযোগ লাভ করে তখনই নাগরিক সাম্যের অস্তিত্ব আছে বলে ধরে নেয়া যায়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সম্পদ, স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশিষে এ সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়। রাষ্ট্র কোন নাগরিকের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করলে নাগরিক সাম্য ব্যাহত হতে বাধ্য।
সামাজিক সাম্যঃ সামাজিক সাম্য সমাজের মধ্যে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান সামাজিক সুযোগ-সুবিধাদির উপস্থিতি নির্দেশ করে। সামাজিক ক্ষেত্রে কোনরূপ বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান থাকবে না এটিই সামাজিক সাম্যের মূল কথা। রাষ্ট্র ও সমাজ কারও জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান করবে না।
রাজনৈতিক সাম্যঃ সকল নাগরিকের সমান রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করার সুযোগ-সুবিধার উপস্থিতি নির্দেশ করে রাজনৈতিক সাম্য। সকল নাগরিক যাতেকরে রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে তা নিশ্চিত করা উচিত। উপযুক্ত যোগ্যতা সাপেক্ষে প্রতিটি নাগরিকেরই ভোট প্রদানের অধিকার, নির্বাচিত হওয়ার অধিকার, সরকারী চাকুরী লাভের অধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে সমান সুযোগ থাকা একান্তআবশ্যক। অন্যথায় রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া সুদূরপরাহত।
অর্থনৈতিক সাম্যঃ অর্থনৈতিক সাম্য বলতে বোঝায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের উপস্থিতি। রাষ্ট্রের সকল সম্পদের উপর জাতি, ধর্ম, বর্ণ, স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে। এক্ষেত্রে কোন ভেদাভেদ থাকবে না। প্রকৃতপক্ষে অর্থনৈতিক সাম্য সকল প্রকার অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান ঘটাতে সচেষ্ট হয়। সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজমান থাকলে প্রকৃত সাম্যের উপলব্ধি সম্ভবপর হয় না। এর ফলে কেবল বিত্তবানরাই সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আর বিত্তহীনরা সকল দিক থেকে হয় বঞ্চিত। বস্তুত অর্থনৈতিক সাম্য ব্যতীত রাজনৈতিক সাম্য অর্থহীন হয়ে পড়ে।