কোষের কোষঝিল্লি দিয়ে ঘেরা এবং নিউক্লিয়াসের বাইরে অবস্থিত জেলির মতো অর্ধতরল অংশটিই হলো সাইটোপ্লাজম। কোষের প্রাণশক্তি বজায় রাখতে এর ভূমিকা অপরিসীম। সাইটোপ্লাজমের প্রধান কাজগুলো নিচে আলোচনা করা হলোঃ
- কোষের বিভিন্ন ধরনের অঙ্গাণু ও নির্জীব পদার্থগুলোকে ধারণ করে।
- বিপাকীয় কার্যাদি পরিচালনা করে।
- রেচন প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশন করে।
- কোষের অম্লত্ব ও ক্ষারকত্ব নিয়ন্ত্রণ করে।
- আবর্তনের মাধ্যমে অঙ্গাণুগুলোকে নড়াচড়ায় সহায়তা করে।
- পানি পরিশোষণে সহায়তা করে।
- উত্তেজনায় সাড়া দিয়ে জীবের বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে।

সাইটোপ্লাজমের কাজ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলোঃ
১. কাঠামোগত ও ধারক কাজ
- কোষের আকার বজায় রাখা: কোষের ভেতরের চাপ নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট আকৃতি দান করে।
- অঙ্গাণু ধারণ: মাইটোকন্ড্রিয়া, রাইবোসোম, গোলগি বডি ইত্যাদি সব ক্ষুদ্রাঙ্গকে ধারণ করে।
- অঙ্গাণুর অবস্থান রক্ষা: কোষীয় কঙ্কাল বা সাইটোস্কেলেটনের মাধ্যমে অঙ্গাণুগুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে আটকে রাখে।
- সাইটোস্কেলেটন গঠন: কোষের অভ্যন্তরীণ কাঠামো বা ‘হাড়’ হিসেবে কাজ করে।
- আঠালো মাধ্যম প্রদান: কোষের ভেতরে একটি জেলির মতো ঘন মাধ্যম তৈরি করে।
২. বিপাকীয় ও রাসায়নিক বিক্রিয়া
- গ্লাইকোলাইসিস: শসনের প্রথম ধাপ (গ্লাইকোলাইসিস) এখানে সম্পন্ন হয়।
- বিপাকীয় কাজের কেন্দ্র: কোষের অধিকাংশ রাসায়নিক বিক্রিয়া এখানেই ঘটে।
- অ্যামিনো অ্যাসিড সঞ্চয়: প্রোটিন তৈরির কাঁচামাল বা অ্যামিনো অ্যাসিড জমা রাখে।
- এনজাইম সরবরাহ: বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম ধারণ করে।
- গ্লুকোজ সঞ্চয়: গ্লাইকোজেন বা স্টার্চ হিসেবে শক্তি সঞ্চয় করে রাখে।
৩. পরিবহন ও সঞ্চালন
- সাইক্লোসিস বা আবর্তন: সাইটোপ্লাজম সবসময় ঘুরতে থাকে, যা পুষ্টি উপাদান চলাচলে সাহায্য করে।
- পুষ্টি পরিবহন: কোষে গৃহীত খাদ্য কণা বিভিন্ন অঙ্গাণুর কাছে পৌঁছে দেয়।
- বর্জ্য নিষ্কাশন: কোষের বর্জ্য পদার্থগুলোকে রেচন অঙ্গাণুর কাছে নিয়ে যায়।
- আয়ন বিনিময়: সোডিয়াম, পটাশিয়াম ইত্যাদি আয়নের ভারসাম্য রক্ষা করে।
- সংকেত আদান-প্রদান: কোষের এক অংশ থেকে অন্য অংশে রাসায়নিক সংকেত পাঠায়।
৪. সংশ্লেষণ ও শক্তি উৎপাদন
- প্রোটিন সংশ্লেষণ: রাইবোসোমের মাধ্যমে প্রোটিন তৈরিতে সহায়তা করে।
- লিপিড সংশ্লেষণ: ফ্যাট বা চর্বি জাতীয় উপাদান তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
- এটিপি (ATP) বণ্টন: মাইটোকন্ড্রিয়ায় উৎপন্ন শক্তি পুরো কোষে ছড়িয়ে দেয়।
- হরমোন সংশ্লেষণ: নির্দিষ্ট কোষে হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে।
- ভিটামিন সঞ্চয়: বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ উপাদান সাময়িকভাবে জমা রাখে।
৫. সুরক্ষা ও ভারসাম্য
- ঘাত সহনশীলতা: বাইরের আঘাত থেকে কোষের নাজুক অঙ্গাণুগুলোকে রক্ষা করে।
- pH নিয়ন্ত্রণ: কোষের অম্লত্ব ও ক্ষারত্বের ভারসাম্য বজায় রাখে।
- পানির ভারসাম্য: অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় কোষের পানির পরিমাণ ঠিক রাখে।
- বিষাক্ত পদার্থ নিষ্ক্রিয়করণ: ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।
- তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: কোষের ভেতরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখে।
৬. কোষ বিভাজন ও বৃদ্ধি
- কোষ বিভাজনে সাহায্য: সাইটোকাইনেসিস প্রক্রিয়ায় সাইটোপ্লাজম দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে নতুন কোষ তৈরি করে।
- স্পিন্ডল তন্তু গঠন: কোষ বিভাজনের সময় মাইক্রোটিউবিউলস তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
- কোষের বৃদ্ধি: নতুন সাইটোপ্লাজম তৈরির মাধ্যমে কোষ আকারে বড় হয়।
- জেনেটিক তথ্যের বিচরণ: নিউক্লিয়াস থেকে আসা mRNA-কে রাইবোসোমে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
- কোষীয় সংকেত গ্রহণ: কোষের বাইরের পরিবেশ থেকে উদ্দীপনা গ্রহণ করে সাড়া দেয়।