এককেন্দ্রিক সরকার পাঠ শেষ জানতে পারবেন-
> এককেন্দ্রিক সরকার কি তা ব্যখ্যা করতে পারবেন;
> এককেন্দ্রিক সরকারের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে পারবেন;
> এককেন্দ্রিক সরকারের গুণ আলোচনা করতে পারবেন;
> এককেন্দ্রিক সরকারের দোষ বলতে পারবেন।
এককেন্দ্রিক সরকার এক ধরনের একক, অখণ্ড ও সুসংবদ্ধ সরকার ব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকে। এ ধরনের শাসন ব্যবস্থায় কেন্দ্রই থাকে সকল ক্ষমতার উৎস। এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় আঞ্চলিক বা স্থানীয় সরকারের অস্তিত্ব থাকতে পারে, এ সরকারগুলো কিছু কিছু ক্ষমতা উপভোগ করতেও পারে। তবে তাদের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে এ সরকারগুলো তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে। কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছা করলে এ ক্ষমতা বাড়াতে পারে, কমাতেও পারে। এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় স্থানীয় বা আঞ্চলিক সরকারগুলোর সাংবিধানিক কোন ক্ষমতা নেই। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, বাংলাদেশ এ ধরনের সরকারের উদাহরণ।
এককেন্দ্রিক সরকারের বৈশিষ্ট্য
- ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণ সরকারের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা কেন্দ্রের উপর ন্যস্ত থাকে।
- কেন্দ্রের মাধ্যমে ক্ষমতার বন্টন এককেন্দ্রিক সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ ব্যবস্থায় আঞ্চলিক বা স্থানীয় সরকার থাকতে পারে। কিন্তু তারা ক্ষমতা লাভ করে কেন্দ্রের কাছ থেকে। কেন্দ্র তার ইচ্ছামত এ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে বা কমাতে পারে।
- এককেন্দ্রিক সরকারের আঞ্চলিক বা স্থানীয় সরকারগুলো কোন স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে না। এরা কেন্দ্রীয় বা একক সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে ক্ষমতা ব্যবহার করে।
- এককেন্দ্রিক সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর ঐক্য। যেহেতু এ ধরনের সরকারের ক্ষমতার বিভাজন নেই, তাই জটিলতাও কম। শাসন ব্যবস্থায় সাংগঠনিক সারল্য বিদ্যমান এবং নীতি প্রণয়নের সমস্যা কম।
এককেন্দ্রিক সরকারের গুণ
এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থায় অনেকগুলো গুণ রয়েছে। নিচে তা আলোচনা করা হলো:
- এককেন্দ্রিক সরকারের অন্যতম গুণ হল এর সাংগঠনিক সরলতা। এ সরকার খুব সহজেই সংগঠিত হতে পারে। প্রয়োজন শুধু এককেন্দ্রিক সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের ফলেই সরকার গঠনের জটিল সমস্যাটি সহজ হয়ে ওঠে। কারণ এ ধরনের ব্যবস্থায় ক্ষমতা বিভক্তিকরণের কোন প্রয়োজন হয় না, তাই একটি মাত্র সরকারই প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
- এককেন্দ্রিক সরকার সহজে কার্যক্রম হতে পারে। কারণ এ ধরনের ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা একটি কেন্দ্রে ন্যস্ত থাকে। তাই যে কোন সমস্যার সমাধান দ্রুত করা যায়। এখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কম থাকে বলে কোন সমস্যার সমাধানে পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়। এছাড়া একই কেন্দ্র থেকে আইন প্রয়োগ হয় বলে সর্বত্র একই আইন বিরাজমান।
- এককেন্দ্রিক সরকার কম ব্যয়বহুল। কারণ এ ধরনের ব্যবস্থায় নীতি প্রণয়ন, নীতি প্রয়োগ ও নীতি পর্যবেক্ষণ কোন সমস্যা হয় না। সরকার একটি মাত্র কেন্দ্র থেকে সবধরনের কাজ পরিচালনা করতে পারে।
- একটি মাত্র কেন্দ্র থেকে শাসন ক্ষমতা প্রয়োগ ও পরিচালনা হয় বলে যে কোন সমস্যা মোকাবেলায় এ ধরনের সরকার নমনীয়ভাবে সমাধানে আসতে পারে। প্রয়োজনে অতি বিপদেও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যা নিরসন করতে পারে।
- এককেন্দ্রিক সরকার খুব দ্রুত যে কোন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিপদ ও সংকটের মোকাবিলা করতে পারে। কারণ এখানে একটি মাত্র কেন্দ্রের হাতেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে। প্রাদেশিক বা আঞ্চালিক সরকার থাকলেও ক্ষমতা তাদের হাতে থাকে না বরং তারা কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে।
- এককেন্দ্রিক সরকার বিশেষত ছোট রাষ্ট্রের জন্য বেশী উপযোগী। এছাড়াও যে সব রাষ্ট্রে ভৌগলিক, জাতীয়, সাংস্কৃতিক ঐক্য আছে সে সব রাষ্ট্রের এ ধরনের সরকার ব্যবস্থা উপযোগী।
- শাসনতান্ত্রিক যে কোন সংস্কার সাধনের জন্য এককেন্দ্রিক সরকার অত্যন্ত উপযোগী। কারণ দ্রুত কোন সংস্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ও জনগণের উন্নয়ন এ ধরনের সরকার ব্যবস্থায় সহজসাধ্য।
- এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থায় একটি কেন্দ্রের অধীন শাসন কার্য পরিচালনা হয় বলে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বজায় থাকে। দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সম্ভাবনা কম থাকে।
- এককেন্দ্রিক সরকার সামাজিক উন্নয়নের ধারক ও বাহক। এ ব্যবস্থায় সরকার তার ক্ষমতা, দক্ষতা, মেধা, শক্তি ও সামর্থ্য একত্রিত করে যে কোন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে আত্মনিয়োগ করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের পাশাপাশি জনগণের জীবনের উন্নয়ন সাধন করতে পারে।
- এ ব্যবস্থায় সময়ের অপচয় কম হয়। কারণ কেন্দ্রীয় সরকারকে কোন প্রাদেশিক সরকার, কোন বিভাগ বা স্তর-কারও সাথে আলাপ আলোচনা করতে হয় না। তাই সময়ের অপচয় যেমন রোধ করা যায়, কাজও দ্রুত সমাধা করা যায়।
এককেন্দ্রিক সরকারের দোষ
অনেকগুলো গুণের পাশাপাশি এককেন্দ্রিক সরকারের কতকগুলো দোষও আছে, যে দোষগুলোর কারণে এ ধরনের সরকার ব্যবস্থার প্রয়োগযোগ্যতা কিছুটা হলেও সীমিত হয়েছে। নীচে এককেন্দ্রিক সরকারের দোষগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো:
- এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা স্বৈরতন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রস্তুত করে। কারণ এখানে ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে বলে শাসক সহজে স্বৈরশাসকে পরিণত হতে পারেন।
- এ ধরনের সরকার ব্যবস্থায় আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবে অর্পিত হয় না ফলে আঞ্চলিক বা স্থানীয় সমস্যার অনেক সময়ই সমাধান করা সম্ভব হয় না। স্থানীয় সমস্যা উপেক্ষিত থাকে।
- স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিভাজন নেই বলে স্থানীয় ব্যক্তিরা রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না। ফলে স্থানীয় নেতৃত্ব বিকশিত হয় না। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পরবর্তীতে রাজনীতি সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েন, গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য এ মনোভাব কাম্য নয়।
- এককেন্দ্রিক সরকারি ব্যবস্থায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা খুব বেশী দেখা যায়। যেহেতু শাসনক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে, তাই এ ধরনের ব্যবস্থায় আমলাদের ক্ষমতা ও প্রভাব খুব বৃদ্ধি পেতে পারে। আমলারাও শাসন ক্ষমতার হস্তক্ষেপ করে জটিলতা বৃদ্ধি করেন ফলে কাজ সম্পাদনের গতি ধীরে হয়ে পড়ে।
- এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় শাসন পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকে কেন্দ্রের হাতে। ফলে কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা ও কাজের চাপ বৃদ্ধি পায়। তাই কোন কোন সময় কেন্দ্র সুষ্ঠুভাবে কাজ সম্পাদনে সক্ষম হয় না। বিশেষতঃ আন্তর্জাতিক সমস্যা মোকাবেলায় ব্যস্ত থেকে জাতীয় সমস্যার সমাধান উপেক্ষিত হতে পারে।
- এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থা বড় বড় রাষ্ট্রের জন্য উপযোগী নয়। ছোট ভুখন্ড, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থাকে সাফল্য দিতে পারে। বৃহৎ রাষ্ট্র জনগোষীতে এর প্রয়োগ হলে শাসনকার্য দূরুহ হয়ে পড়ে।