ইতিহাস পরিচিতি

প্রতিটি জাতিগোষ্ঠী জাতিসত্তার পরিচয় জেনে গৌরব বোধ করে। বাংলাদেশেরও আছে গৌরব করার মতো ইতিহাস, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, বিজয় ছিনিয়ে আনার ইতিহাস। প্রায় দুইশত বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং ২৩ বছরের পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতিতে ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতা। বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম হয়েছে একটি নতুন স্বাধীন দেশ, বাংলাদেশ। বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং গৌরবময় মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে ও আত্ম-অনুসন্ধান করতে এবং জাতির পরিচয় অনুসন্ধান করতে হলে ইতিহাস পড়তে হবে, চর্চা করতে হবে। কারণ ইতিহাস ঘটনার অনুসন্ধানকৃত, গবেষণালব্ধ, প্রতিষ্ঠিত সত্য উপস্থাপন করে। এজন্য ইতিহাস সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধান করতে হলে ইতিহাসের উপাদান ও প্রকারভেদ সম্পর্কেও জানতে হবে।

এজন্য আগে আমাদের জানতে হবে ইতিহাস কী? জানতে হবে কত ধরনের ইতিহাস লেখা যায় বা ইতিহাস কত ধরনের হয়। ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তাই বা কী? এই অধ্যায়ে এসব বিষয় নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে।

ইতিহাস পরিচিতি, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, বাঙালির মুক্তির বিজয়-উল্লাস,

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারণা

ইতিহাস‘ শব্দটির উৎপত্তি ‘ইতিহ’ শব্দ থেকে; যার অর্থ ‘ঐতিহ্য’। ঐতিহ্য হচ্ছে অতীতের অভ্যাস, শিক্ষা, ভাষা, শিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতি যা ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষিত থাকে। এই ঐতিহ্যকে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয় ইতিহাস। ই. এইচ. কার-এর ভাষায় বলা যায়, ইতিহাস হলো বর্তমান ও অতীতের মধ্যে এক অন্তহীন সংলাপ।

বর্তমানের সকল বিষয়ই অতীতের ক্রমবিবর্তন ও অতীত ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আর অতীতের ক্রমবিবর্তন ও ঐতিহ্যের বিবরণই হলো ইতিহাস। তবে এখন সমসাময়িক কালের ইতিহাসও লেখা হয়, যাকে বলে সাম্প্রতিক ইতিহাস। সুতরাং ইতিহাসের পরিসর সুদুর অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিস্তৃত।

ইতিহাস শব্দটির সন্ধিবিচ্ছেদ করলে এরূপ দাঁড়ায়, ইতিহ আস। যার অর্থ এমনই ছিল বা এরূপ ঘটেছিল। ঐতিহাসিক ড. জনসনও ঘটে যাওয়া ঘটনাকেই ইতিহাস বলেছেন। তাঁর মতে, যা কিছু ঘটে তাই ইতিহাস। যা ঘটে না তা ইতিহাস নয়।

গ্রিক শব্দ ‘হিস্টরিয়া’ (Historia) থেকে ইংরেজি হিস্টরি (History) শব্দটির উৎপত্তি, যার বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে ইতিহাস। ‘হিস্টরিয়া’ শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস (খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতক)। তিনিই সর্বপ্রথম তাঁর গবেষণাকর্মের নামকরণে এ শব্দটি ব্যবহার করেন, যার আভিধানিক অর্থ হলো সত্যানুসন্ধান বা গবেষণা। তিনি বিশ্বাস করতেন, ইতিহাস হলো-যা সত্যিকার অর্থে ছিল বা সংঘটিত হয়েছিল তা অনুসন্ধান করা ও লেখা। তিনি তাঁর গবেষণায় গ্রিস ও পারস্যের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় অনুসন্ধান করেছেন। এতে তিনি প্রাপ্ত তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং গ্রিসের বিজয়গাথা লিপিবদ্ধ করেছেন। হেরোডোটাসই প্রথম ইতিহাস এবং অনুসন্ধান-এ দুটি ধারণাকে সংযুক্ত করেন। ফলে ইতিহাস পরিণত হয় বিজ্ঞানে, পরিপূর্ণভাবে হয়ে ওঠে তথ্যনির্ভর এবং গবেষণার বিষয়ে। ইতিহাসবিদ ব‍্যাপসন বলেছেন, ইতিহাস হলো ঘটনার বৈজ্ঞানিক এবং ধারাবাহিক বর্ণনা।

আধুনিক ইতিহাসের জনক জার্মান ঐতিহাসিক লিওপোল্ড ফন্ র‍্যাংকে মনে করেন, প্রকৃতপক্ষে যা ঘটেছিল তার অনুসন্ধান ও তার সত্য বিবরণই ইতিহাস। ইতিহাস বিদ্যমান তথ্য ও প্রমাণ যাচাইসাপেক্ষে লেখা হয় বটে, তবে সব সময়ই নতুন তথ্য-প্রমাণ ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলের সাপেক্ষে পুনর্লিখিত হবার সুযোগ থাকে।

ইতিহাসের উপাদান

যেসব তথ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিক সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব, তাকেই ইতিহাসের উপাদান বলা হয়। ইতিহাসের উপাদানকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: লিখিত উপাদান ও অলিখিত উপাদান।

১. লিখিত উপাদান

ইতিহাস রচনার লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সাহিত্যকর্মেও তৎকালীন সময়ের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। যেমন: বেদ, কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’, কলহনের ‘রাজতরঙ্গিনী’, মিনহাজ-উস-সিরাজের ‘তবকাত-ই-নাসিরী’, আবুল ফজল-এর ‘আইন-ই-আকবরী’ ইত্যাদি।

বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ সব সময়ই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে বিবেচিত হয়েছে। যেমন- পঞ্চম থেকে সপ্তম শতকে বাংলায় আগত চৈনিক পরিব্রাজক যথাক্রমে ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাং ও ইৎসিং-এর বর্ণনা। পরবর্তী সময়ে আফ্রিকান পরিব্রাজক ইবনে বতুতাসহ অন্যদের লেখাতেও এ অঞ্চল সম্পর্কে বিবরণ পাওয়া গিয়েছে। এসব বর্ণনা থেকে তৎকালীন সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা যায়।

সাহিত্য উপাদান

(ক) জীবনী গ্রন্থ: সন্ধ্যাকর নন্দীর- ‘রামচরিত’, বানভট্টের ‘হর্ষ চরিত’ চর্যাপদ, মঙ্গল কাব্য ইত্যাদি
(খ) দেশীয় সাহিত্য : কলহনের ‘রাজতরঙ্গিনী’, কালিদাসের ‘মেঘদূত’ ইত্যাদি।
(গ) বিদেশি পর্যটকদের বিবরণী: মেগাস্থিনিসের ‘ইণ্ডিকা’, ফা-হিয়েনের ‘ফো-কুয়ো-কি’; হিউয়েন সাং-এর ‘সি-ইউ-কি’ ইবনে বতুতার ‘রিহালা’ ইত্যাদি।
(ঘ) প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ: রামায়ণ, মহাভারত, জাতক, পুরাণ ইত্যাদি।
(ঙ) অন্যান্য: প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, সন্ধি-চুক্তি, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, ফেরদৌসীর শাহনামা ইত্যাদি।

২. অলিখিত উপাদান: প্রত্নতাত্ত্বিক

যেসব বস্তু বা উপাদান থেকে আমরা বিশেষ সময়, স্থান বা ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক তথ্য পাই, সেই বস্তু বা উপাদানই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এই নিদর্শনসমূহ মূলত অলিখিত উপাদান।
(ক) লিপিমালা:
সরকারি লিপি: যুদ্ধবিগ্রহ, ভূমিদান, রাজার আদেশ, রাজার নাম, রাজ্য জয়, রাজত্বকাল, ধর্মবিশ্বাস প্রভৃতি সম্পর্কে জানা যায়।
বেসরকারি লিপি: এগুলো সাধারণত পাথরে মন্দিরের গায়ে লেখা হতো।
(খ) মুদ্রা: মুদ্রায় রাজার নাম, সন-তারিখ, রাজার মূর্তি, নানা দেব-দেবীর মূর্তি খোদাই করা থাকত। যা থেকে রাজার সময়কাল, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সমাজব্যবস্থা ও ধর্মবিশ্বাস প্রভৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
(গ) স্থাপত্য-ভাস্কর্য ও স্মৃতিসৌধ : প্রত্নকেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত প্রাচীন সমাধি, স্তম্ভ, স্মৃতিস্তম্ভ, প্রাচীন শিল্পকীর্তি, দেব-দেবীর মূর্তি, মৃৎশিল্প, মৃৎপাত্র ও তৈজসপত্রাদি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত। যেগুলো থেকে সভ্যতার উৎকর্ষ যেমন বোঝা যায়, তেমনি এতে নাগরিক জ্ঞানের সৌন্দর্যভাব ও সাংস্কৃতিক মনোভাবও ফুটে ওঠে।
(ঘ) প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন: বগুড়ার মহাস্থানগড়, নওগাঁর পাহাড়পুর, কুমিল্লার ময়নামতি, নরসিংদীর ‘উয়ারী-বটেশ্বর’ ও বাগেরহাটের ‘ষাট গম্বুজ’ মসজিদ ইত্যাদি।
(ঙ) প্রচলিত বিশ্বাস বা প্রথা : কিংবদন্তী, রূপকথা, গান, কাহিনিমালা, বেদ ইত্যাদি। বেদ প্রথম দিকে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। এজন্য একে ‘শ্রুতি’ বলা হতো। পরবর্তীকালে একাধিক রচয়িতা যেমন: ঋষি বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, ভরদ্বাজ, রামদেব, ভৃগু প্রমুখ দীর্ঘদিন ধরে বেদ রচনা করেন।
(চ) পুঁথি: একসময় পুঁথিও মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল।

এ সমস্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশ্লেষণের ফলে সে সময়ের অধিবাসীদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ধারণা করা সম্ভব প্রাচীন অধিবাসীদের সভ্যতা, ধর্ম, জীবনযাত্রা, নগরায়ণ, নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র, ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা, কৃষি উপকরণ ইত্যাদি সম্পর্কে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় সিন্ধু সভ্যতা, বাংলাদেশের মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, ময়নামতি ইত্যাদি স্থানের প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনের কথা। নতুন নতুন প্রত্নতত্ত্ব আবিষ্কার বদলে দিতে পারে একটি জাতির ইতিহাস। যেমন- সম্প্রতি নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতত্ত্ব আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের ফলে বাংলার প্রাচীন সভ্যতার নবদিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে বাংলার প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে অনেক ধারণা। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো নতুন ভাবে লিখতে হবে বাংলার প্রাচীন ইতিহাস।

ইতিহাসের প্রকারভেদ

মানবসভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন বিষয়ের ইতিহাস লেখা হচ্ছে। ফলে সম্প্রসারিত হচ্ছে ইতিহাসের পরিসর। ইতিহাস বিরামহীনভাবে অতীতের ঘটনা বর্তমান প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়। সেক্ষেত্রে ইতিহাসকে বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত করা কঠিন। তাছাড়া ইতিহাসের বিষয়বস্তুতে মানুষ, মানুষের সমাজ, সভ্যতা ও জীবনধারা পরস্পর সম্পৃক্ত এবং পরিপূরক।

তারপরও পঠন-পাঠন, আলোচনা ও গবেষণাকর্মের সুবিধার্থে ইতিহাসকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- ভৌগোলিক অবস্থানগত ও বিষয়বস্তুগত ইতিহাস।

১. ভৌগোলিক অবস্থানগত ইতিহাস : ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক থেকে বোঝার সুবিধার্থে ইতিহাসকে আবারও তিন ভাগে ভাগ করা যায় যথা- স্থানীয় বা আঞ্চলিক ইতিহাস, জাতীয় ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক ইতিহাস।

২. বিষয়বস্তুগত ইতিহাস: কোনো বিশেষ বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে যে ইতিহাস রচিত হয়, তাকে বিষয়বস্তুগত ইতিহাস বলা হয়। ইতিহাসের বিষয়বস্তুগত পরিসর ব্যাপক। সাধারণভাবে একে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়, যথা- রাজনৈতিক ইতিহাস, সামাজিক ইতিহাস, অর্থনৈতিক ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও সাম্প্রতিক ইতিহাস।

ইতিহাসের বিষয়বস্তু

মানবসমাজ ও সভ্যতার ধারাবাহিক পরিবর্তনের প্রমাণ ও লিখিত দলিল হলো ইতিহাস। ঐতিহাসিক ভিকো (Vico) মনে করেন, মানব সমাজ ও মানবীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের উৎপত্তি ও বিকাশই ইতিহাসের বিষয়বস্তু।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, যা মানবসমাজ-সভ্যতার উন্নতি ও অগ্রগতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে, তা সবই ইতিহাসের আলোচ্য বিষয়। যেমন- শিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতি, দর্শন, স্থাপত্য, রাজনীতি, যুদ্ধ, ধর্ম, আইন প্রভৃতি বিষয়, সামগ্রিকভাবে যা কিছু সমাজ-সভ্যতা বিকাশে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে, তা-ই ইতিহাসের বিষয়বস্তু।

ইতিহাসের বৈশিষ্ট্য

ইতিহাস জ্ঞান অর্জনের অন্যান্য শাখা থেকে আলাদা। এর রচনা ও উপস্থাপনার পদ্ধতিও ভিন্ন। ইতিহাসের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করলে এ সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
প্রথমত, তথ্যের সাহায্যে অতীতের বর্ণনা ও ব্যাখ্যাদান করাই ইতিহাসের বৈশিষ্ট্য।
দ্বিতীয়ত, ইতিহাসের আলোচনার বিষয় হচ্ছে মানবসমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতির ধারাবাহিক তথ্যনির্ভর বিবরণ।
তৃতীয়ত, ইতিহাস থেমে থাকে না, এটি গতিশীল এবং বহমান। যে কারণে প্রাচীনযুগ, মধ্যযুগ, আধুনিকযুগ সন-তারিখ ব্যবহার করে ভাগ করা কঠিন। আবার পরিবর্তনের ধারাও সব দেশে একসঙ্গে ঘটেনি।
চতুর্থত, ঘটে যাওয়া ঘটনার সঠিক বিবরণ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাও ইতিহাসের বৈশিষ্ট্য। তবে ঘটনার নিরপেক্ষ বর্ণনা না হলে সেটা সঠিক ইতিহাস হবে না।

ইতিহাসের পরিসর

মানুষ যাপিত জীবনের সকল বিষয় ইতিহাসের আওতাভুক্ত। মানুষের চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনা, কার্যক্রম-যত শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত, ইতিহাসের সীমাও ততদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। যেমন- প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রথম পর্বের মানুষের কর্মকাণ্ড খাদ্য সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে সে সময় ইতিহাসের পরিসরও খাদ্য সংগ্রহমূলক কর্মকাণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস চর্চা ও গবেষণায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসৃত হচ্ছে। ফলে ইতিহাসের শাখা-প্রশাখাও বৃদ্ধি পেয়েছে, বিস্তৃত হচ্ছে ইতিহাসের সীমানাও। উনিশ শতকে শুধু রাজনীতি ইতিহাসের বিষয় হলেও মার্কসবাদ প্রচারের পর অর্থনীতি, সমাজ, শিল্পকলাসহ জনজীবনের সামগ্রিক ইতিহাসও রচিত হতে থাকে। চৌদ্দ শতকের ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন মানুষের গোষ্ঠী জীবন, সংস্কৃতি, উৎপাদন প্রণালীকে ইতিহাসের পাঠ্যবিষয়ে পরিণত করেন। এভাবে একের পর এক বিষয় ইতিহাসভুক্ত হচ্ছে আর সম্প্রসারিত হচ্ছে ইতিহাসের পরিধি ও পরিসর।

ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা

মানবসমাজ ও সভ্যতার বিবর্তনের গবেষণালব্ধ উপস্থাপনই ইতিহাস। ইতিহাস পাঠ মানুষকে অতীতের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান অবস্থা বুঝতে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান করতে সাহায্য করে। ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে আমরা মানবসমাজের ক্রমবিকাশ ও সভ্যতার বিবর্তনের ধারা সম্পর্কে জানতে পারি। তাই দেশ ও জাতির স্বার্থে এবং ব্যক্তির প্রয়োজনে ইতিহাস পাঠ অত্যন্ত জরুরি।

জ্ঞান ও আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করে: অতীতের বর্ণনা মানুষের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। ঐতিহাসিক ঘটনা কিংবা মানুষের সামাজিক জীবনের বিকাশ জানার মাধ্যমে আত্মমর্যাদাবোধ বৃদ্ধি হয়।

সচেতনতা বৃদ্ধি করে: ইতিহাস-জ্ঞান মানুষকে সচেতন করে তোলে। উত্থান-পতন এবং সভ্যতার বিকাশ ও পতনের কারণগুলো জানতে পারলে মানুষ ভালো-মন্দের পার্থক্যটা সহজেই বুঝতে পারে। ফলে সে তার কর্মের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকে।

দৃষ্টান্তের সাহায্যে শিক্ষা দেয় : ইতিহাসের ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষ ইতিহাস পাঠ করে অতীত ঘটনাবলির দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নিতে পারে। ইতিহাসের শিক্ষা বর্তমানের প্রয়োজনে কাজে লাগানো যেতে পারে।

ইতিহাস পাঠ করলে বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতা বাড়ে, যা দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে সাহায্য করে। ফলে জ্ঞান চর্চার প্রতি আগ্রহ জন্মে।

error: Content is protected !!